Express Train

হাওর এক্সপ্রেস ট্রেনের সময়সূচী ও ভাড়ার তালিকা ২০২৬

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বলা হয় হাওর অঞ্চলকে। আর এই হাওর অধ্যুষিত নেত্রকোনা ও মোহনগঞ্জ অঞ্চলের মানুষের যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো রেলপথ। ঢাকা থেকে মোহনগঞ্জ ও মোহনগঞ্জ থেকে ঢাকা রুটে যে কয়টি আন্তঃনগর ট্রেন চলাচল করে তার মধ্যে হাওর এক্সপ্রেস অন্যতম। আপনি কি নিরাপদ এবং স্বাচ্ছন্দ্যময় ভ্রমণের জন্য হাওর এক্সপ্রেস ট্রেনের সময়সূচী খুঁজছেন? তাহলে এই আর্টিকেলটি আপনার জন্য।

আজকের এই পোষ্টে আমরা হাওর এক্সপ্রেস ট্রেনের সময়সূচী, ভাড়ার তালিকা, বিরতি স্টেশন এবং অনলাইনে টিকিট কাটার নিয়ম সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব। যারা নিয়মিত এই রুটে যাতায়াত করেন কিংবা প্রথমবারের মতো হাওর বা নেত্রকোনা ভ্রমণে যাচ্ছেন, তাদের জন্য এই তথ্যগুলো অত্যন্ত জরুরি। বাসের জ্যাম আর ভোগান্তি এড়াতে ট্রেনের বিকল্প নেই, আর হাওর এক্সপ্রেস সেই যাত্রাকে করে তোলে আরও আনন্দদায়ক।

হাওর এক্সপ্রেস ট্রেনের পরিচিতি

হাওর এক্সপ্রেস বাংলাদেশ রেলওয়ে পরিচালিত একটি জনপ্রিয় আন্তঃনগর ট্রেন। এই ট্রেনটি রাজধানী ঢাকা এবং নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জের মধ্যে চলাচল করে। ট্রেনটি তার সময়ানুবর্তিতা এবং ভালো যাত্রীসেবার জন্য বেশ পরিচিত। বিশেষ করে যারা পর্যটক, টাঙ্গুয়ার হাওর বা নেত্রকোনা ভ্রমণে যেতে চান, তাদের কাছে এই ট্রেনটি প্রথম পছন্দ। হাওর এক্সপ্রেস ট্রেন নম্বর ৭৭৭ (ঢাকা থেকে মোহনগঞ্জ) এবং ৭৮৮ (মোহনগঞ্জ থেকে ঢাকা) নাম্বারে চলাচল করে। আধুনিক বগি, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর কারণে যাত্রীদের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশি।

হাওর এক্সপ্রেস ট্রেনের সময়সূচী ২০২৬

ট্রেন ভ্রমণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সঠিক সময়সূচী জানা। আপনি যদি হাওর এক্সপ্রেস ট্রেনের সময়সূচী সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখেন, তবে স্টেশনে গিয়ে অযথা অপেক্ষা করতে হবে না। ঢাকা এবং মোহনগঞ্জ উভয় প্রান্ত থেকেই ট্রেনটি একটি নির্দিষ্ট সময়ে ছেড়ে যায়। নিচে বিস্তারিত সময়সূচী তুলে ধরা হলো:

ঢাকা টু মোহনগঞ্জ ট্রেনের সময়সূচী (ট্রেন নং ৭৭৭)

ঢাকা কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে হাওর এক্সপ্রেস প্রতিদিন রাতে মোহনগঞ্জের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। যারা অফিস শেষ করে বা রাতের বেলা ভ্রমণ করতে পছন্দ করেন, তাদের জন্য এই সময়টি খুবই সুবিধাজনক।

  • ছাড়ার স্থান: ঢাকা কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন।
  • ছাড়ার সময়: রাত ১০:১৫ মিনিট (২২:১৫)।
  • পৌঁছানোর সময়: ভোর ৪:৪০ মিনিট।
  • সাপ্তাহিক ছুটির দিন: বুধবার।

অর্থাৎ, সপ্তাহের বুধবার ছাড়া প্রতিদিন রাত ১০:১৫ মিনিটে ট্রেনটি ঢাকার কমলাপুর স্টেশন ছেড়ে যায় এবং পরদিন ভোরে মোহনগঞ্জ পৌঁছায়।

মোহনগঞ্জ টু ঢাকা ট্রেনের সময়সূচী (ট্রেন নং ৭৭৮)

মোহনগঞ্জ থেকে যারা ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হতে চান, তাদের জন্য হাওর এক্সপ্রেস সকালে যাত্রা শুরু করে। এটি দিনের বেলা ভ্রমণের জন্য উপযুক্ত।

  • ছাড়ার স্থান: মোহনগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন।
  • ছাড়ার সময়: সকাল ৮:০০ মিনিট।
  • পৌঁছানোর সময়: দুপুর ১:৪০ মিনিট (১৩:৪০)।
  • সাপ্তাহিক ছুটির দিন: বৃহস্পতিবার।

অর্থাৎ, বৃহস্পতিবার ছাড়া সপ্তাহের বাকি ৬ দিন সকাল ৮টায় ট্রেনটি মোহনগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসে এবং দুপুরে ঢাকায় পৌঁছায়।

হাওর এক্সপ্রেস ট্রেনের বিরতি স্টেশন ও সময়সূচী

হাওর এক্সপ্রেস ঢাকা থেকে মোহনগঞ্জ যাওয়ার পথে এবং ফিরে আসার পথে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে যাত্রাবিরতি দেয়। আপনি যদি মাঝখানের কোনো স্টেশন থেকে উঠতে বা নামতে চান, তবে এই তালিকাটি আপনার কাজে লাগবে। প্রতিটি স্টেশনে ট্রেনটি ২ থেকে ৫ মিনিট পর্যন্ত বিরতি দিয়ে থাকে। নিচে ঢাকা থেকে মোহনগঞ্জ (৭৭৭) এবং মোহনগঞ্জ থেকে ঢাকা (৭৭৮) রুটের বিরতি স্টেশনগুলোর বিস্তারিত সময়সূচী দেওয়া হলো:

স্টেশনের নামঢাকা থেকে পৌঁছানোর সময় (৭৭৭)মোহনগঞ্জ থেকে পৌঁছানোর সময় (৭৭৮)
বিমানবন্দর স্টেশনরাত ১০:৪৮দুপুর ১:০০
জয়দেবপুর জংশনরাত ১১:০৫দুপুর ১২:৩৫
গফরগাঁওরাত ১২:০৪বেলা ১১:১০
ময়মনসিংহ জংশনরাত ১২:৫০সকাল ১০:০৫
গৌরীপুর জংশনরাত ১:৩৫সকাল ৯:৩১
শ্যামগঞ্জরাত ১:৫২সকাল ৯:১৫
নেত্রকোনারাত ২:১৭সকাল ৮:৪৭
বারহাট্টারাত ২:৫০সকাল ৮:১৪

(বিদ্র: রেলওয়ের অপারেশনাল কারণে এই সময়সূচীতে সামান্য পরিবর্তন হতে পারে। ভ্রমণের আগে রেল সেবা অ্যাপ থেকে লাইভ ট্র্যাকিং দেখে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।)

হাওর এক্সপ্রেস ট্রেনের ভাড়ার তালিকা ২০২৬

ট্রেন ভ্রমণের আগে ভাড়ার তালিকা জানা থাকলে বাজেট করা সহজ হয়। বাংলাদেশ রেলওয়ে যাত্রীদের সুবিধার্থে বিভিন্ন শ্রেণীর আসন ব্যবস্থা রেখেছে। আপনি আপনার সামর্থ্য ও পছন্দ অনুযায়ী শোভন চেয়ার থেকে শুরু করে এসি বার্থ পর্যন্ত যেকোনো সিট বুক করতে পারেন। নিচে হাওর এক্সপ্রেস ট্রেনের আসন বিন্যাস অনুযায়ী টিকিটের মূল্য (১৫% ভ্যাটসহ) দেওয়া হলো।

উল্লেখ্য, দূরত্ব এবং আসন ভেদে ভাড়ার তারতম্য হয়। এখানে ঢাকা টু মোহনগঞ্জ রুটের সম্পূর্ণ ভাড়ার তালিকা দেওয়া হলো:

  • শোভন চেয়ার: এটি সাধারণ কিন্তু আরামদায়ক সিট। এর বর্তমান ভাড়া ২০৫ টাকা
  • স্নিগ্ধা (এসি সিট): যারা এসি বগিতে বসে ভ্রমণ করতে চান, তাদের জন্য স্নিগ্ধা ক্লাস। এর ভাড়া ২৫০ টাকা থেকে শুরু (দূরত্বভেদে পরিবর্তন হতে পারে)।
  • ফার্স্ট ক্লাস বার্থ: রাতে ঘুমানোর সুবিধা সহ নন-এসি কেবিন। এর ভাড়া ৫৭০ টাকা
  • এসি বার্থ: এটি ট্রেনের সবচেয়ে বিলাসবহুল সিট, যেখানে এসি এবং ঘুমানোর সুবিধা রয়েছে। এর ভাড়া ৮৫১ টাকা

(সতর্কবার্তা: টিকিটের মূল্য বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ যেকোনো সময় পরিবর্তন করতে পারে। তাই টিকিট কাটার সময় কাউন্টার বা অনলাইন থেকে বর্তমান ভাড়া নিশ্চিত হয়ে নিন।)

হাওর এক্সপ্রেস ট্রেনে কেন ভ্রমণ করবেন?

ঢাকা থেকে নেত্রকোনা বা মোহনগঞ্জ রুটে বাসের চেয়ে ট্রেন ভ্রমণ কেন বেশি সুবিধাজনক, তার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে:

  • সড়ক পথের খানাখন্দ আর জ্যামের ভোগান্তি থেকে মুক্তি পেতে ট্রেন সেরা মাধ্যম। বিশেষ করে পরিবার বা শিশুদের নিয়ে ভ্রমণের জন্য ট্রেন অনেক নিরাপদ।
  • হাওর এক্সপ্রেস সাধারণত সঠিক সময়ে চলাচল করে। বাসের মতো জ্যামে আটকে থাকার ভয় নেই।
  • ট্রেনটি যখন ভৈরব, কিশোরগঞ্জ বা ময়মনসিংহের গ্রামীণ জনপদ দিয়ে চলে, তখন জানালার বাইরের দৃশ্য মন ভালো করে দেয়। বিশেষ করে হাওর অঞ্চলের কাছাকাছি পৌঁছালে দুপাশের দৃশ্য অসাধারণ লাগে।
  • বাসের তুলনায় ট্রেনের শোভন চেয়ারের ভাড়া অনেক কম এবং আরামদায়ক।

অনলাইনে হাওর এক্সপ্রেস ট্রেনের টিকেট কাটার নিয়ম

এখন আর স্টেশনে গিয়ে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কাটার প্রয়োজন নেই। আপনি ঘরে বসেই খুব সহজে ‘Rail Sheba’ অ্যাপ অথবা বাংলাদেশ রেলওয়ের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে টিকিট কাটতে পারেন।

  1. প্রথমে বাংলাদেশ রেলওয়ের ই-টিকিটিং ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন।
  2. আপনার মোবাইল নাম্বার ও এনআইডি দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করুন।
  3. ‘From’ অপশনে Dhaka এবং ‘To’ অপশনে Mohanganj সিলেক্ট করুন।
  4. যাত্রার তারিখ এবং ‘Haor Express’ ট্রেন সিলেক্ট করুন।
  5. আপনার পছন্দের সিট বেছে নিন এবং অনলাইন পেমেন্ট (বিকাশ, নগদ, রকেট বা কার্ড) এর মাধ্যমে টাকা পরিশোধ করুন।
  6. টিকেট কনফার্ম হলে মেইলে বা অ্যাপে টিকেট চলে আসবে, যা প্রিন্ট করে বা মোবাইলে দেখিয়েই ভ্রমণ করা যাবে।

ভ্রমণের আগে কিছু প্রয়োজনীয় টিপস

একটি সুন্দর ও নির্বিঘ্ন ভ্রমণের জন্য কিছু বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি:

  • টিকিট অগ্রিম কাটুন: হাওর এক্সপ্রেস অত্যন্ত জনপ্রিয় ট্রেন, তাই ভ্রমণের অন্তত ৩-৪ দিন আগে অনলাইনে টিকিট কেটে রাখা ভালো।
  • স্টেশনে উপস্থিতি: ট্রেন ছাড়ার অন্তত ৩০ মিনিট আগে স্টেশনে পৌঁছান। ঢাকা কমলাপুর বা বিমানবন্দর স্টেশন অনেক বড়, তাই প্ল্যাটফর্ম খুঁজে পেতে সময় লাগতে পারে।
  • খাবার ও পানি: ট্রেনে প্যান্ট্রি কার বা খাবারের ব্যবস্থা থাকে, তবে নিজের সাথে হালকা খাবার ও পানি রাখা ভালো।
  • আইডি কার্ড: ভ্রমণের সময় নিজের এনআইডি কার্ড বা তার ফটোকপি সাথে রাখুন, টিটিই চেক করতে চাইলে দেখাতে হতে পারে।

মোহনগঞ্জ স্টেশন থেকে টাঙ্গুয়ার হাওর যাওয়ার উপায়

অনেকেই হাওর এক্সপ্রেস ব্যবহার করেন টাঙ্গুয়ার হাওর ভ্রমণের উদ্দেশ্যে। মোহনগঞ্জ স্টেশনে নেমে আপনি সিএনজি বা লেগুনা রিজার্ভ করে মধ্যনগর বাজার বা তাহিরপুর যেতে পারেন। সেখান থেকে নৌকা ভাড়া করে হাওরের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। মোহনগঞ্জ থেকে টাঙ্গুয়ার হাওর যাওয়ার পথটি এখন বেশ উন্নত হয়েছে, ফলে পর্যটকদের আনাগোনাও বেড়েছে।

প্রশ্ন-উত্তর সেকশন (FAQs)

হাওর এক্সপ্রেস সপ্তাহে কতদিন চলাচল করে?

হাওর এক্সপ্রেস সপ্তাহে ৬ দিন চলাচল করে। ঢাকা থেকে বুধবার এবং মোহনগঞ্জ থেকে বৃহস্পতিবার ট্রেনটি বন্ধ থাকে।

ঢাকা থেকে মোহনগঞ্জ যেতে কত সময় লাগে?

ঢাকা থেকে মোহনগঞ্জ যেতে হাওর এক্সপ্রেসে প্রায় সাড়ে ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা সময় লাগে।

হাওর এক্সপ্রেসে কি খাবার পাওয়া যায়?

হ্যাঁ, হাওর এক্সপ্রেসে একটি খাবার বগি (ক্যান্টিন) সংযুক্ত থাকে। সেখানে স্ন্যাকস, চা, এবং ভারী খাবার কিনতে পাওয়া যায়।

হাওর এক্সপ্রেসের এসি টিকিট কি অনলাইনে পাওয়া যায়?

হ্যাঁ, রেল সেবা অ্যাপ বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে শোভন চেয়ারের পাশাপাশি স্নিগ্ধা ও এসি বার্থের টিকিটও কাটা যায়।

বিমানবন্দর স্টেশনে কি হাওর এক্সপ্রেস থামে?

হ্যাঁ, ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়ার সময় এবং আসার পথে ট্রেনটি ঢাকা বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনে যাত্রাবিরতি দেয়।

শেষ কথা

ঢাকা টু মোহনগঞ্জ রুটে যাতায়াতের জন্য হাওর এক্সপ্রেস ট্রেনের সময়সূচী এবং সঠিক তথ্য জানা থাকলে আপনার ভ্রমণ হবে অনেক সহজ ও আরামদায়ক। হাওর অঞ্চলের মানুষের প্রাণের স্পন্দন এই ট্রেনটি প্রতিদিন হাজারো যাত্রীকে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দিচ্ছে। আপনি যদি অফিসিয়াল কাজ, পারিবারিক সফর বা নিছক ভ্রমণের জন্য এই রুট ব্যবহার করেন। তবে হাওর এক্সপ্রেস হতে পারে আপনার সেরা সঙ্গী। আশা করি, আজকের এই আর্টিকেলের মাধ্যমে আপনারা ভাড়ার তালিকা, সময়সূচী এবং বিরতি স্টেশন সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা পেয়েছেন। আপনার পরবর্তী যাত্রা শুভ ও নিরাপদ হোক।

Nustrat Jahan

আমি রেলওয়ে সেবা ওয়েব সাইটে পরিচালনা করে থাকি। আমার উদ্দেশ্য সাধারণ মানুষকে সঠিক তথ্য প্রদান করা রেলে সম্পর্কে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button