বুড়িমারী এক্সপ্রেস ট্রেনের সময়সূচী ২০২৬। ভাড়া ও স্টেশন তালিকা
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ২০২৪ সালের ১২ মার্চ থেকে যাত্রা শুরু করে আন্তঃনগর বুড়িমারী এক্সপ্রেস। লালমনিরহাট ও রংপুরবাসীর জন্য এই ট্রেনটি ছিল এক দীর্ঘদিনের দাবি। অনেক জল্পনা-কল্পনার পর অবশেষে ঢাকা ও উত্তরের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রান্তের মধ্যে সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে। ২০২৫ সালের ৯ মার্চ থেকে অনলাইনে টিকেট বিক্রিও শুরু হয়েছে। যারা লালমনিরহাট, কাউনিয়া, গাইবান্ধা, বগুড়া ও আশপাশের এলাকার বাসিন্দা, তাদের জন্য বুড়িমারী এক্সপ্রেস এখন ভ্রমণের একটি আরামদায়ক ও দ্রুত মাধ্যম।
ভারতের দার্জিলিং ও ভুটান সীমান্তবর্তী বুড়িমারী স্থলবন্দরের কৌশলগত অবস্থান বিবেচনায় এই রুটটির গুরুত্ব অপরিসীম। সড়কপথে যাতায়াত যেমন সময়সাপেক্ষ, তেমনি ব্যয়বহুল। বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই ট্রেন চালু করে। আজকের এই লেখায় বুড়িমারী এক্সপ্রেসের সময়সূচি, ভাড়া, স্টেশন তালিকা, শাটল ট্রেনের তথ্য এবং এসি সিট ও বার্থ সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য আলোচনা করা হবে।
বুড়িমারী এক্সপ্রেস ট্রেনের সময়সূচী ২০২৬ (আন্তঃনগর)
বুড়িমারী এক্সপ্রেস বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃনগর ট্রেন। ট্রেনটি ঢাকা থেকে লালমনিরহাট হয়ে সীমান্তবর্তী বুড়িমারী স্টেশন পর্যন্ত যায়। তবে বর্তমানে পূর্ণ রেক পরিচালনার বিষয়টি পর্যায়ক্রমে হচ্ছে। নিচে ট্রেনটির সময়সূচি উল্লেখ করা হলো:
- ঢাকা থেকে বুড়িমারীগামী ট্রেন (৮০৯ নং বুড়িমারী এক্সপ্রেস): ঢাকা কমলাপুর থেকে সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে ছেড়ে লালমনিরহাট পৌঁছে সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে। এরপর শাটল ট্রেনের মাধ্যমে যাত্রীরা বুড়িমারী যেতে পারেন।
- বুড়িমারী থেকে ঢাকাগামী ট্রেন (৮১০ নং বুড়িমারী এক্সপ্রেস): লালমনিরহাট থেকে রাত ৯টা ১৫ মিনিটে ছেড়ে ঢাকায় পৌঁছে সকাল ৬টা ৩০ মিনিটে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: বুড়িমারী এক্সপ্রেস ট্রেনের অফ ডে বা সাপ্তাহিক ছুটি মঙ্গলবার (ঢাকা থেকে যাত্রার ক্ষেত্রে)। লালমনিরহাট থেকে ঢাকাগামী ট্রেনের সাপ্তাহিক ছুটি সোমবার। ভ্রমণের আগে এই তথ্য যাচাই করে নেওয়া জরুরি।
বুড়িমারী এক্সপ্রেসের স্টেশন তালিকা ও যাত্রাবিরতি
ট্রেনটি ঢাকা থেকে বুড়িমারী যাত্রাপথে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে যাত্রাবিরতি দেয়। নিচের সারণিতে দুটি কলামে ঢাকা থেকে বুড়িমারী এবং বুড়িমারী থেকে ঢাকার সময়সূচি দেওয়া হলো:
| স্টেশনের নাম | ঢাকা টু বুড়িমারী (ছাড়ার সময়) | বুড়িমারী টু ঢাকা (ছাড়ার সময়) |
|---|---|---|
| ঢাকা কমলাপুর | সকাল ৮:৩০ | সকাল ৬:৩০ |
| বিমানবন্দর | সকাল ৮:৫৮ | — |
| ঈশ্বরদী | দুপুর ১২:৩০ | — |
| নাটোর | দুপুর ১:০৫ | ভোর ২:০০ |
| সান্তাহার | দুপুর ২:২০ | ভোর ১:০০ |
| বগুড়া | বিকাল ৩:০৫ | রাত ১২:০৮ |
| মাহিমাগঞ্জ | বিকাল ৩:৪৬ | রাত ১১:২২ |
| বোনারপাড়া | বিকাল ৪:০০ | রাত ১১:১৫ |
| গাইবান্ধা | বিকাল ৪:৩০ | রাত ১০:৪৭ |
| কাউনিয়া | বিকাল ৫:৪৫ | রাত ৯:৩৫ |
| লালমনিরহাট | সন্ধ্যা ৬:১০ | রাত ৯:১০ |
| কাকিনা | সন্ধ্যা ৭:০০ | রাত ১০:৪৩ |
| তুষভাণ্ডার | সন্ধ্যা ৭:৪৫ | সন্ধ্যা ৭:৩৩ |
| হাতীবান্ধা | রাত ৮:২১ | সন্ধ্যা ৭:০২ |
| বোরখাটা | রাত ৮:৪৮ | সন্ধ্যা ৬:৫০ |
| পাটগ্রাম | রাত ৯:২৩ | সন্ধ্যা ৬:২০ |
| বুড়িমারী | রাত ৯:৪৫ | সন্ধ্যা ৬:০০ |
উল্লেখ্য, নতুন সময়সূচীতে পীরগাছা, বামনডাঙ্গা, সোনাতলা ও জয়দেবপুর জংশন স্টেশনে যাত্রাবিরতি রাখা হয়নি। এই বিষয়ে স্থানীয় যাত্রীদের মধ্যে কিছু অসন্তোষ থাকলেও রেল কর্তৃপক্ষ সময় ও দূরত্ব বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বুড়িমারী শাটল ট্রেনের সময়সূচী ২০২৬
লালমনিরহাট থেকে বুড়িমারী পর্যন্ত যাতায়াতের জন্য শাটল ট্রেন চালু আছে। বুড়িমারী এক্সপ্রেসের সাথে সমন্বয় রেখেই এই শাটল চলে। নিচে শাটল ট্রেনের সময়সূচি দেওয়া হলো:
| ট্রেনের নাম | ছাড়ার সময় | আসার সময় |
|---|---|---|
| ১১৩ নং শাটল | লালমনিরহাট – দুপুর ২:৩০ | বুড়িমারী – বিকাল ৪:৩০ |
| ১১৪ নং শাটল | বুড়িমারী – বিকাল ৪:৫০ | লালমনিরহাট – সন্ধ্যা ৬:৫০ |
| ১১৫ নং শাটল | লালমনিরহাট – সন্ধ্যা ৭:১০ | বুড়িমারী – রাত ৯:১০ |
| ১১৬ নং শাটল | বুড়িমারী – রাত ৯:৩০ | লালমনিরহাট – রাত ১১:৩০ |
শাটল ট্রেনগুলোর সাপ্তাহিক ছুটি (অফ ডে) মঙ্গলবার।
বুড়িমারী এক্সপ্রেস ট্রেনের ভাড়া ২০২৬ (শোভন, স্নিগ্ধা ও এসি)
বুড়িমারী এক্সপ্রেসের টিকেটের মূল্য অন্যান্য আন্তঃনগর ট্রেনের মতোই যুক্তিসঙ্গত। নিচে গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনভিত্তিক ভাড়া তুলে ধরা হলো:
- ঢাকা টু লালমনিরহাট: শোভন চেয়ার ৬৩৫ টাকা, স্নিগ্ধা ১২১৪ টাকা, এসি সিট ১৪৫৫ টাকা
- ঢাকা টু গাইবান্ধা: শোভন চেয়ার ৫৫০ টাকা, স্নিগ্ধা ১০৫৩ টাকা, এসি সিট ১২৬০ টাকা
- ঢাকা টু বোনারপাড়া: শোভন চেয়ার ৫২৫ টাকা, স্নিগ্ধা ১০০৭ টাকা, এসি সিট ১২০৮ টাকা
- ঢাকা টু বগুড়া: শোভন চেয়ার ৪৭৫ টাকা, স্নিগ্ধা ৯০৯ টাকা, এসি সিট ১০৯৩ টাকা
- ঢাকা টু সান্তাহার: শোভন চেয়ার ৪৩০ টাকা, স্নিগ্ধা ৮১৭ টাকা, এসি সিট ৯৯৪ টাকা
- ঢাকা টু নাটোর: শোভন চেয়ার ৩৭৫ টাকা, স্নিগ্ধা ৭১৯ টাকা
- ঢাকা টু বিমানবন্দর: শোভন চেয়ার ৫০ টাকা, স্নিগ্ধা ১১৫ টাকা, এসি সিট ১২৭ টাকা
- ঢাকা টু বুড়িমারী/পাটগ্রাম: শোভন চেয়ার ৭৩০ টাকা (আনুমানিক)
উল্লেখ্য, ০৪/০৫/২০২৫ তারিখ থেকে নতুন হারে এসি বার্থ ও সিটের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। ঢাকা-লালমনিরহাট রুটে এসি বার্থের ভাড়া ২১৮০ টাকা এবং এসি সিট ১৪৫৫ টাকা। টিকেট কেনার সময় ভ্যাট ও সার্ভিস চার্জ যুক্ত থাকতে পারে।
এসি কেবিন ও বার্থ সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য
বুড়িমারী এক্সপ্রেসে বর্তমানে একটি তাপানুকুল স্লিপার কোচ (এসি কেবিন) রয়েছে। এই কোচে মোট ৭টি কেবিন আছে। দিনের বেলায় কেবিনগুলো এসি সিট হিসেবে এবং রাতের বেলায় বার্থ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কেবিনে সিট ও বার্থের বিন্যাস নিম্নরূপ:
- কেবিন নং ১: সিট ১-৬, বার্থ ১-২
- কেবিন নং ২: সিট ৭-৯, বার্থ ৩-৪
- কেবিন নং ৩: সিট ১০-১৫, বার্থ ৫-৮
- কেবিন নং ৪: সিট ১৬-২১, বার্থ ৯-১২
- কেবিন নং ৫: সিট ২২-২৪, বার্থ ১৩-১৪
- কেবিন নং ৬: সিট ২৫-২৭, বার্থ ১৫-১৬
- কেবিন নং ৭: সিট ২৮-৩৩, বার্থ ১৭-১৮
ট্রেনটির সামগ্রিক কোচ কম্পোজিশন: ২টি খাবার গাড়ি (WECDR), ১টি পাওয়ার কার (WPC), ১টি এসি কেবিন কোচ (WJC), ২টি এসি চেয়ার কোচ (WJCC) ও ৮টি শোভন চেয়ার কোচ (WEC)। মোট কোচ সংখ্যা ১৪/২৮ লোড অনুযায়ী।
টিকেট কাটার নিয়ম ও অনলাইন বুকিং
২০২৫ সালের মার্চ থেকে বুড়িমারী এক্সপ্রেসের টিকেট বাংলাদেশ রেলওয়ের ই-টিকেটিং সিস্টেম (eticket.railway.gov.bd) থেকে কেনা যাচ্ছে। এছাড়া সরাসরি স্টেশন কাউন্টার থেকেও টিকেট সংগ্রহ করা যায়। যাত্রার অন্তত ৭ দিন আগে অনলাইনে টিকেট বুকিং দেওয়া ভালো। টিকেট কেনার সময় যাত্রীর এনআইডি ও মোবাইল নম্বর আবশ্যক। অনলাইন টিকেট পেতে প্রথমে ওয়েবসাইটে রেজিস্ট্রেশন করুন, তারপর যাত্রার তারিখ ও গন্তব্য নির্বাচন করে আসন বুক করে বিকাশ, নগদ বা রকেটের মাধ্যমে মূল্য পরিশোধ করুন।
বুড়িমারী এক্সপ্রেস নিয়ে সাধারণ জিজ্ঞাসা
প্রশ্ন ১: বুড়িমারী এক্সপ্রেস ট্রেনের অফ ডে কবে?
উত্তর: ঢাকা থেকে যাত্রার ক্ষেত্রে অফ ডে মঙ্গলবার। লালমনিরহাট থেকে ঢাকাগামী ট্রেনের অফ ডে সোমবার।
প্রশ্ন ২: বুড়িমারী শাটল ট্রেনের অফ ডে কবে?
উত্তর: বুড়িমারী শাটল ট্রেন বন্ধ থাকে মঙ্গলবার।
প্রশ্ন ৩: ঢাকা থেকে লালমনিরহাট এসি সিটের ভাড়া কত?
উত্তর: ঢাকা থেকে লালমনিরহাট এসি সিটের ভাড়া ১৪৫৫ টাকা (ভ্যাটসহ)। এসি বার্থের জন্য ২১৮০ টাকা লাগে।
প্রশ্ন ৪: বুড়িমারী এক্সপ্রেসের স্টপেজ কোথায় কোথায়?
উত্তর: এই ট্রেনের স্টপেজ: ঢাকা কমলাপুর, বিমানবন্দর, ঈশ্বরদী, নাটোর, সান্তাহার, বগুড়া, মাহিমাগঞ্জ, বোনারপাড়া, গাইবান্ধা, কাউনিয়া, লালমনিরহাট, কাকিনা, তুষভাণ্ডার, হাতীবান্ধা, বোরখাটা, পাটগ্রাম ও বুড়িমারী।
প্রশ্ন ৫: কীভাবে বুড়িমারী এক্সপ্রেসের টিকেট পাব?
উত্তর: আপনি eticket.railway.gov.bd ওয়েবসাইট থেকে অনলাইনে টিকেট কাটতে পারেন। এছাড়া লালমনিরহাট বা ঢাকা কমলাপুর স্টেশনের কাউন্টার থেকেও টিকেট পাওয়া সম্ভব।
প্রশ্ন ৬: শাটল ট্রেন কি বুড়িমারী পর্যন্ত যায়?
উত্তর: হ্যাঁ, শাটল ট্রেন লালমনিরহাট থেকে বুড়িমারী পর্যন্ত চলাচল করে। সময়সূচি উপরের সারণিতে দেওয়া হয়েছে।
প্রশ্ন ৭: রাতে এসি বার্থ বুক করতে চাইলে কি আলাদা টিকেট লাগে?
উত্তর: রাতের বেলায় এসি কেবিন বার্থ হিসেবে ব্যবহারযোগ্য। এসি বার্থের টিকেট এসি সিটের চেয়ে আলাদা দামে বিক্রি হয়। বার্থ বুকিং দিতে চাইলে সেটি নির্দিষ্ট বার্থ নম্বর উল্লেখ করে কাউন্টারে বা অনলাইনে করতে হবে।
প্রশ্ন ৮: বুড়িমারী এক্সপ্রেসের কোচের মান কেমন?
উত্তর: ট্রেনটিতে ইন্দোনেশিয়ান কোচ ব্যবহার করা হয়েছে, যা আধুনিক ও আরামদায়ক। লালমনি/রংপুর/কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসের মতো একই মানের কোচ রয়েছে।
সর্বশেষ পরিস্থিতি ও যাত্রীদের জন্য পরামর্শ
২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ট্রেনটি নিয়মিত চলাচল করছে। প্রশাসনিক সুবিধার্থে বর্তমানে একটি রেক দিয়ে চললেও ভবিষ্যতে যাত্রীচাপ বিবেচনা করে ডাবল রেক ও বুড়িমারী পর্যন্ত সরাসরি রেক চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। লালমনিরহাট স্টেশনে বুড়িমারী এক্সপ্রেসের জন্য অপেক্ষমাণ কক্ষ, টয়লেট ও খাবারের ব্যবস্থা উন্নত করা হয়েছে। যাত্রীদের অনুরোধ, ট্রেন ধরতে কমপক্ষে ৩০ মিনিট আগে স্টেশনে পৌঁছানো এবং অনলাইন টিকেটের স্ক্রিনশট বা প্রিন্ট কপি সঙ্গে রাখা।



