যশোর টু খুলনা ট্রেনের সময়সূচী ও ভাড়া ২০২৬
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় রেলপথ একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশেষ করে যশোর এবং খুলনা একে অপরের পরিপূরক দুটি জেলা হওয়ায় প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এই রুটে যাতায়াত করেন। সড়ক পথের যানজট ও ভোগান্তি এড়াতে নিরাপদ বাহন হিসেবে ট্রেন যাত্রীদের প্রথম পছন্দ। আপনি কি ২০২৬ সালের সর্বশেষ আপডেট অনুযায়ী যশোর টু খুলনা ট্রেনের সময়সূচী খুঁজছেন? তাহলে আপনি একদম সঠিক জায়গায় এসেছেন। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা যশোর থেকে খুলনাগামী সকল ট্রেনের সময়সূচী, ভাড়ার তালিকা এবং টিকেট কাটার নিয়ম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
যশোর জংশন বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন এবং গুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ে স্টেশন। এখান থেকে খুলনার দূরত্ব খুব বেশি না হলেও, সঠিক সময়ে গন্তব্য পৌঁছানোর জন্য ট্রেনের সময় জানাটা জরুরি। অনেক সময় ট্রেনের সময় পরিবর্তন হয়, তাই যাত্রীদের সুবিধার্থে আমরা বাংলাদেশ রেলওয়ে থেকে সংগ্রহ করা তথ্যের ভিত্তিতে এই গাইডটি সাজিয়েছি। চলুন, দেরি না করে জেনে নেওয়া যাক ভ্রমণের খুঁটিনাটি সকল তথ্য।
যশোর টু খুলনা রুটে ট্রেন
কেন আপনি বাসে না গিয়ে ট্রেনে যাতায়াত করবেন? এর পেছনে বেশ কিছু যৌক্তিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, যশোর থেকে খুলনার সড়ক পথে প্রায়ই মেরামতের কাজ বা ট্রাফিক জ্যামের কারণে সময় বেশি লাগে। কিন্তু ট্রেনে আপনি নির্দিষ্ট সময়ে এবং জ্যামমুক্তভাবে পৌঁছাতে পারবেন। দ্বিতীয়ত, ট্রেনের ভাড়া বাসের তুলনায় সাশ্রয়ী এবং আরামদায়ক। বিশেষ করে যারা পরিবার, বয়স্ক সদস্য বা শিশুদের নিয়ে ভ্রমণ করেন, তাদের জন্য ট্রেনের সিটগুলো বেশ প্রশান্তিদায়ক। এছাড়া ট্রেনের টয়লেট সুবিধা এবং নামাজের ব্যবস্থা থাকায় যাত্রাপথ আরও সহজ হয়।
আরও জেনে নিনঃ ঢাকা টু খুলনা ট্রেনের সময়সূচী
যশোর টু খুলনা চলাচলকারী ট্রেনের তালিকা
বর্তমানে যশোর থেকে খুলনা রুটে মোট ১০টি ট্রেন নিয়মিত চলাচল করে। এর মধ্যে ৬টি হলো আন্তঃনগর (Intercity) ট্রেন এবং বাকি ৪টি হলো মেইল বা এক্সপ্রেস ট্রেন। আন্তঃনগর ট্রেনগুলো সাধারণত দ্রুতগামী হয় এবং এতে সেবার মান উন্নত থাকে। অন্যদিকে মেইল ট্রেনগুলো সব স্টেশনে থামে বলে সময় কিছুটা বেশি লাগে।
আন্তঃনগর ট্রেনসমূহ:
১. কপোতাক্ষ এক্সপ্রেস (৭১৬)
২. সুন্দরবন এক্সপ্রেস (৭২৬)
৩. রূপসা এক্সপ্রেস (৭২৮)
৪. সীমান্ত এক্সপ্রেস (৭৪৮)
৫. সাগরদাঁড়ি এক্সপ্রেস (৭৬২)
৬. চিত্রা এক্সপ্রেস (৭৬৪)
মেইল ও কমিউটার ট্রেনসমূহ:
১. মহানন্দা এক্সপ্রেস (১৬)
২. রকেট এক্সপ্রেস (২৪)
৩. নকশিকাথা এক্সপ্রেস (২৬)
৪. বেনাপোল কমিউটার (৫৪)
এই ট্রেনগুলো ছুটির দিন ছাড়া সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতে নির্দিষ্ট সময়ে চলাচল করে। নিচে আমরা প্রতিটি ট্রেনের সময়সূচী আলাদাভাবে তুলে ধরছি।
যশোর টু খুলনা ট্রেনের সময়সূচী ২০২৬
যাত্রীদের সুবিধার্থে আমরা সময়সূচীটিকে দুটি ভাগে ভাগ করেছি। প্রথমে আন্তঃনগর এবং পরে মেইল ট্রেনের সময়সূচী দেওয়া হলো। আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী সময় মিলিয়ে নিন। মনে রাখবেন, স্টেশনে ট্রেন ছাড়ার অন্তত ২০-৩০ মিনিট আগে পৌঁছানো বুদ্ধিমানের কাজ।
যশোর টু খুলনা আন্তঃনগর ট্রেনের সময়সূচী
আন্তঃনগর ট্রেনগুলো সাধারণত সঠিক সময় মেনে চলে। নিচে ছক আকারে সময়সূচী দেওয়া হলো:
| ট্রেনের নাম | ট্রেন নাম্বার | ছেড়ে যায় (যশোর) | পৌঁছায় (খুলনা) | সাপ্তাহিক ছুটি |
| চিত্রা এক্সপ্রেস | ৭৬৪ | ০৩:৪৪ AM | ০৫:০০ AM | রবিবার |
| সাগরদাঁড়ি এক্সপ্রেস | ৭৬২ | ১০:৩৯ AM | ১২:১০ PM | সোমবার |
| সুন্দরবন এক্সপ্রেস | ৭২৬ | ০২:৩৫ PM | ০৩:৫০ PM | বুধবার |
| সীমান্ত এক্সপ্রেস | ৭৪৮ | ০২:৫৯ PM | ০৪:২০ PM | সোমবার |
| রূপসা এক্সপ্রেস | ৭২৮ | ০৫:০৭ PM | ০৬:২০ PM | বৃহস্পতিবার |
| কপোতাক্ষ এক্সপ্রেস | ৭১৬ | ০৭:০৫ PM | ০৮:২৫ PM | শুক্রবার |
বিদ্র: ট্রেনের সময়সূচী বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যেকোনো সময় পরিবর্তিত হতে পারে। তাই ভ্রমণের আগে অনলাইন বা স্টেশনের নোটিশ বোর্ড থেকে নিশ্চিত হয়ে নেওয়া ভালো।
যশোর টু খুলনা মেইল ও এক্সপ্রেস ট্রেনের সময়সূচী
যারা লোকাল বা মেইল ট্রেনে যাতায়াত করতে পছন্দ করেন অথবা কম খরচে ভ্রমণ করতে চান, তাদের জন্য এই ট্রেনগুলো উপযুক্ত। তবে এই ট্রেনগুলোতে আন্তঃনগর ট্রেনের মতো নির্দিষ্ট সিট বরাদ্দের নিয়ম সব সময় মানা হয় না।
| ট্রেনের নাম | ট্রেন নাম্বার | ছেড়ে যায় (যশোর) | পৌঁছায় (খুলনা) | সাপ্তাহিক ছুটি |
| মহানন্দা এক্সপ্রেস | ১৬ | ০২:৪০ PM | ০৪:৪০ PM | নেই |
| বেনাপোল কমিউটার | ৫৪ | ০৪:৪৪ PM | ০৬:১০ PM | নেই |
| নকশিকাথা এক্সপ্রেস | ২৬ | ০৮:০০ PM | ১০:০০ PM | নেই |
| রকেট এক্সপ্রেস | ২৪ | ১০:২৫ PM | ১১:৪৫ PM | নেই |
যশোর টু খুলনা ট্রেনের ভাড়ার তালিকা ২০২৬
ভ্রমণের বাজেটের জন্য টিকিটের মূল্য জানাটা খুব জরুরি। যশোর টু খুলনা ট্রেনের ভাড়া নির্ভর করে আপনি কোন ক্লাসের সিটে ভ্রমণ করবেন তার ওপর। রেলওয়েতে সাধারণত শোভন, শোভন চেয়ার, স্নিগ্ধা (এসি), এবং এসি বার্থ—এই কয়েক ধরনের আসন ব্যবস্থা থাকে। মেইল ট্রেনের ভাড়া আন্তঃনগর ট্রেনের চেয়ে কম হয়। নিচে ২০২৬ সালের আপডেট করা ভাড়ার তালিকা দেওয়া হলো।
| আসন বিন্যাস (Class) | টিকিটের মূল্য (টাকা) |
| শোভন সাধারণ | ৫০ টাকা (আনুমানিক) |
| শোভন চেয়ার | ৭০ টাকা |
| প্রথম সিট | ৯৫ টাকা |
| স্নিগ্ধা (AC Chair) | ১৩৩ টাকা |
| এসি সিট | ১৫৬ টাকা |
| এসি বার্থ | ২৩৬ টাকা |
নোট: ভাড়ার সাথে নির্দিষ্ট ভ্যাট যুক্ত থাকে। অনলাইন থেকে টিকিট কাটলে সার্ভিস চার্জ হিসেবে সামান্য কিছু টাকা অতিরিক্ত লাগতে পারে। মেইল ট্রেনের ভাড়া সাধারণত আন্তঃনগরের শোভন চেয়ারের চেয়ে কম হয়।
যশোর টু খুলনা ট্রেনের টিকিট কাটার নিয়ম
তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে ট্রেনের টিকিট কাটার জন্য এখন আর স্টেশনে গিয়ে লম্বা লাইনে দাঁড়ানোর প্রয়োজন নেই। আপনি ঘরে বসেই খুব সহজে Online বা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে টিকিট কাটতে পারেন। তবে যারা সরাসরি স্টেশন থেকে কাটতে চান তাদের জন্য কাউন্টার খোলা থাকে।
অনলাইনে টিকিট কাটার পদ্ধতি:
- ১. ওয়েবসাইট ভিজিট: প্রথমে বাংলাদেশ রেলওয়ের অফিসিয়াল ই-টিকিটিং ওয়েবসাইট
eticket.railway.gov.bd-তে প্রবেশ করুন। - ২. রেজিস্ট্রেশন: আপনার যদি আগে একাউন্ট না থাকে, তবে জাতীয় পরিচয়পত্র (NID), মোবাইল নাম্বার এবং জন্ম তারিখ দিয়ে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করুন।
- ৩. লগইন ও রুট নির্বাচন: একাউন্টে লগইন করার পর “From Station” এ Jashore এবং “To Station” এ Khulna সিলেক্ট করুন। এরপর ভ্রমণের তারিখ দিয়ে “Search Train” বাটনে ক্লিক করুন।
- ৪. আসন নির্বাচন: আপনার পছন্দের ট্রেনের পাশে “View Seats” অপশনে গিয়ে সিট খালি থাকা সাপেক্ষে সিট নির্বাচন করুন।
- ৫. পেমেন্ট: বিকাশ, নগদ, রকেট বা ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে পেমেন্ট সম্পন্ন করলেই আপনার টিকিট কনফার্ম হয়ে যাবে। টিকিটটি ডাউনলোড করে প্রিন্ট করে নিলেই চলবে।
অফলাইন বা কাউন্টার পদ্ধতি:
যশোর রেলওয়ে স্টেশনের কাউন্টারে গিয়ে নির্দিষ্ট ফর্ম পূরণ করে অথবা মৌখিকভাবে গন্তব্য এবং ট্রেনের নাম বলে নগদ টাকার বিনিময়ে টিকিট সংগ্রহ করতে পারেন। যাত্রার অন্তত আধা ঘণ্টা আগে স্টেশনে পৌঁছানো উচিত।
যশোর টু খুলনা দূরত্ব ও সময়
ভ্রমণ পরিকল্পনার জন্য দূরত্ব এবং সময়ের ধারণা রাখা জরুরি। গুগল ম্যাপ এবং রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, যশোর থেকে খুলনার রেলপথে দূরত্ব প্রায় ৬০ কিলোমিটার।
- সময়: আন্তঃনগর ট্রেনে যেতে সাধারণত ১ ঘণ্টা থেকে ১ ঘণ্টা ১৫ মিনিট সময় লাগে। তবে মেইল বা লোকাল ট্রেনে যেহেতু সব স্টেশনে বিরতি দেয়, তাই সেক্ষেত্রে ১ ঘণ্টা ৩০ মিনিট বা তার চেয়ে একটু বেশি সময় লাগতে পারে।
ভ্রমণের আগে কিছু প্রয়োজনীয় টিপস
একটি নিরাপদ ও আনন্দদায়ক ভ্রমণের জন্য কিছু বিষয় লক্ষ্য রাখা উচিত:
- ১. টিকিট প্রিন্ট: অনলাইনে টিকিট কাটলে অবশ্যই টিকিটের একটি হার্ড কপি বা পিডিএফ মোবাইলে সংরক্ষণ করুন।
- ২. সময়ের সতর্কতা: ট্রেন মিস করা থেকে বাঁচতে নির্ধারিত সময়ের অন্তত ৩০ মিনিট আগে স্টেশনে উপস্থিত হোন।
- ৩. মালামাল: আপনার সাথে থাকা ল্যাগেজ বা মূল্যবান সামগ্রী নিজ দায়িত্বে রাখুন।
- ৪. ছুটির দিন: আপনার ভ্রমণের দিনটি ওই ট্রেনের সাপ্তাহিক ছুটির দিন কি না, তা ভালো করে দেখে নিন। যেমন—রবিবার চিত্রা এক্সপ্রেস বন্ধ থাকে।
ট্রেনের আসন পরিচিতি
অনেকেই টিকিটের নাম শুনে বুঝতে পারেন না সিটটি কেমন হবে। তাদের জন্য সংক্ষিপ্ত ধারণা:
- শোভন চেয়ার: এটি নন-এসি চেয়ার কোচ। ফ্যান এবং লাইট থাকে, সিটগুলো বেশ আরামদায়ক। মধ্যবিত্ত যাত্রীদের জন্য এটি সেরা।
- স্নিগ্ধা: এটি এসি চেয়ার কোচ। জানালা বন্ধ থাকে এবং ভেতরটা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। গরমে আরামদায়ক ভ্রমণের জন্য এটি আদর্শ।
- এসি বার্থ: এটি কেবিন বা শোয়ার ব্যবস্থা যুক্ত সিট। সাধারণত লম্বা দূরত্বের যাত্রায় এটি বেশি ব্যবহৃত হয়, তবে যশোর-খুলনা রুটেও কেউ চাইলে বিলাসবহুলভাবে যেতে পারেন।
প্রশ্ন-উত্তর সেকশন (FAQ)
যশোর থেকে খুলনা যাওয়ার প্রথম আন্তঃনগর ট্রেন কোনটি?
দিনের হিসেবে ভোররাত ৩:৪৪ মিনিটে চিত্রা এক্সপ্রেস হলো প্রথম ট্রেন। আর সকালের দিকে ১০:৩৯ মিনিটে সাগরদাঁড়ি এক্সপ্রেস ছেড়ে যায়।
সুন্দরবন এক্সপ্রেস যশোর থেকে কখন ছাড়ে?
সুন্দরবন এক্সপ্রেস দুপুর ০২:৩৫ মিনিটে যশোর স্টেশন থেকে খুলনার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়।
যশোর টু খুলনা ট্রেনের শোভন চেয়ারের ভাড়া কত?
যশোর টু খুলনা রুটে আন্তঃনগর ট্রেনের শোভন চেয়ারের ভাড়া ৭০ টাকা।
শুক্রবার কোন ট্রেন বন্ধ থাকে?
শুক্রবার কপোতাক্ষ এক্সপ্রেসের সাপ্তাহিক ছুটি থাকে। এদিন এই ট্রেন চলাচল করে না।
অনলাইনে টিকিট কাটলে কি বাড়তি টাকা লাগে?
হ্যাঁ, অনলাইনে টিকিট কাটলে ব্যাংক চার্জ বা প্রসেসিং ফি বাবদ ২০-৩০ টাকা অতিরিক্ত লাগতে পারে।
শেষ কথা
যশোর এবং খুলনা এই দুই জেলার মানুষের জন্য ট্রেন যোগাযোগ আশীর্বাদস্বরূপ। স্বল্প ভাড়া ও আরামদায়ক ভ্রমণের জন্য যশোর টু খুলনা ট্রেনের সময়সূচী জেনে রাখা নিয়মিত যাত্রীদের জন্য অপরিহার্য। আশা করি, আজকের এই আর্টিকেলের মাধ্যমে আপনারা ২০২৬ সালের ট্রেনের সময়, ভাড়া এবং টিকিট কাটার নিয়ম সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেয়েছেন।
আপনার যাত্রা নিরাপদ ও আনন্দদায়ক হোক। ট্রেনের সময়সূচী বা অন্য কোনো বিষয়ে যদি আপনার কোনো প্রশ্ন থাকে তবে নিচে কমেন্ট করে জানাতে পারেন। আমরা আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করব। নিয়মিত ট্রেনের আপডেট পেতে আমাদের সাথেই থাকুন।



